ম্যারাথন কথন – পর্ব ২

by

in
গত পর্বে ম্যারাথন সম্পর্কে একটি বেসিক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আর এই পর্বে লিখব প্রথমবারের মত কোন ম্যারাথনে অংশগ্রহণের জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নেয়া উচিত সে বিষয়ে এবং সে সাথে আগ্রহীদের জন্য থাকছে একটি ছোট সুসংবাদ পোস্টের শেষে।
চলুন শুরু করা যাক।
 
১। মানসিক প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণ
আপনাকে শুরুতে এটা মেনে নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে যে আপনাকে মিনিমাম ৬ মাস সময় দিতেই হবে প্রথম কোন ম্যারাথনে অংশগ্রহণের আগে। ফিটনেস ভেদে অনেকের ৮ মাস হতে ১ বছরও লাগতে পারে।
প্রথমবার সবচেয়ে কম দূরত্বের ক্যাটাগরীর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এটা হতে পারে ৭.৫ অথবা ১০ কিলোমিটার । তবে এরচেয়ে কম দূরত্বের কোন ক্যাটাগরী পেলে সেটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে ২-৩ মাসের প্রস্তুতি দিয়ে হয়ত অংশগ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন আমাদের প্রথম ম্যারাথন ছিল কাট্টলী ইভেন্ট যেখানে দূরত্ব ছিল ৪ কিলোমিটার। তবে কম সময়ের প্রস্তুতি দিয়ে আপনি স্ট্রং ফিনিশ করতে পারবেন না।
 
২। টুলস ও আউটফিট
রানিং এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল জুতো। খুব বেশি দামী হতে হবে কথা নেই কারণ মোটামোটি ভাল মানের রানিং সু ১০০০-২০০০ বাজেটের মধ্যে পাওয়া যায়। জুতো কেনার ক্ষেত্রে টেকসই এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কতটুকু আরামাদায়ক, সোল্ডের উপরের কুশন সাপোর্ট কত ভাল এবং পায়ের পাতা সহজে ভাজ করা যায় এমন জুতো।
আর টি-শার্ট ও ট্রাউজারের ক্ষেত্রে দ্রুত ঘাম শুকিয়ে যায় এমন আউটফিট ব্যবহার করা উচিত।
ডিসটেন্স ও পারফরম্যান্স ট্রেক করার জন্য ২০০০-৩০০০ বাজেটের মধ্যে একটি ভাল মানের ব্যান্ড নিতে পারলে লংটার্মে ভাল কাজ দিবে। ব্যান্ড সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে আমার লেখা এই ব্লগটি পড়ে দেখতে পারেন https://club.latifpur.com/fitness-band-price-features/
তবে প্রথম দিকে ব্যান্ড ব্যবহার করতে না পারলেও অন্তত Strava অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত।
 
৩। সাপ্তাহিক রুটিন:
সপ্তাহে ৩ দিন ট্রেনিং হল নতুনদের জন্য সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এতে করে প্রতি সেশনের পর একদিন পাওয়া যায় বডি রিকভারীর জন্য। অনেকে আবেগের বশে সপ্তাহে ৬ দিন করা শুরু করে কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই তারা হেরে যায় বাস্তবতার কাছে।
 
৪। দৈনন্দিন রুটিন:
ম্যারাথনে অংশগ্রহণকারীদের একটি ভালো অভ্যাস অবশ্যই আয়ত্ব করতে হয় আর তা হল রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া এবং সূর্যোদয়ের আগে উঠা। কারণ বেশিরভাগ ম্যারাথন ইভেন্টগুলো শুরু হয় ভোর ৫:৩০ হতে ৬ টার মধ্যে।
 
যারা ফজরের নামায সময়মত আদায় করেন তারা এ ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবেন কারণ এ অভ্যাসটি আগে থেকেই আছে। আর যাদের নেই তাদের প্রথমদিকে কষ্ট হলেও একবার অভ্যাস করে ফেলতে পারলে সারাজীবন আপনি অন্তত এই একটি অভ্যেসের জন্য হলেও নিজেকে বাহবা দিবেন। আর যাদের অনেকবছর ধরে ফজরের নামায সময়মত পড়তে না পারার আফসোস আছে সেটাও ঘুচবে।
 
যেদিন ট্রেনিং সেশন করবেন তার আগের রাত হতেই আপনাকে খাবার ব্যাপারে কিছুটা মনোযোগী হতে হবে। আগের রাতে খুব বেশি ভরপেট না খাওয়া, পানি বেশি খাওয়া এগুলো খেয়াল রাখতে হবে। সেশন এর ৩০ মিনিট আগে একদম হালকা নাস্তা যেমন কলা বা খেজুর এবং সামান্য পানি খেতে পারেন। আর সেশনের পরে যথেষ্ট পরিমাণ শর্করা ও প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে।
খাবার-দাবার, সেশনের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস কিভাবে নেয়া উচিত, ওয়ার্ম আপ, কুল ডাউন এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছিলাম এই ব্লগটিতে: https://club.latifpur.com/basic-running-guide/
 
৫। পারফরম্যান্স মূল্যায়ন:
অনেকে শুরু করার পরও এই ব্যাপারটা নিয়ে মনোযোগ না দেয়ার কারণে পারফরম্যান্স উন্নতি করতে পারেন না। যার ফলে একসময় হতাশ হয়ে ছিঁটকে পড়ে। প্রথমদিকে আপনি পেস ও দূরত্ব নিয়ে চিন্তা করার কোন দরকার নেই। শুধু খেয়াল রাখবেন আপনি একটানা কতক্ষণ দৌড়াতে পারছেন ধীরগতিতে।
প্রথমদিকে হয়ত একমিনিটের বেশি পারবেন না। এরপর হাটুন কিছুক্ষণ। এভাবে দেখবেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৫-১০ মিনিট পারবেন একটানা। আর যেদিন টানা ৩০ মিনিট পারবেন সেদিন বুঝবেন আপনার শরীর প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত ম্যারাথনের জন্য।
 
এরপর আপনি মনোযোগ দিবেন দূরত্বের দিকে। প্রতি সপ্তাহে ১০% করে দূরত্ব বাড়াবেন। তার মানে যদি এই সপ্তাহে ২ কিলো পারেন পরের সপ্তাহে ২.২ কিলোমিটার। এভাবে একসময় ১০ কিলোতে পৌছে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
এরপর দূরত্বের পাশাপাশি পেস নিয়ে কাজ করতে পারেন। তবে সেটা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই যদি আপনার বর্তমান পেসকে উপভোগ করেন। কারণ আমাদের আল্টিমেট টার্গেট ফিনিশার হওয়া শরীরের উপর কোন অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে।
 
৬। কম্যুনিটি ফলো করা:
যেহেতু আপনার ফাইনাল টার্গেট ম্যারাথন ইভেন্ট তাই আপনাকে সবসময় খোঁজ খবর রাখতে হবে নতুন ইভেন্ট কখন আসছে। আর এই খবরগুলো সহজে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের রানিং গ্রুপগুলো ফলো করতে পারেন। যেমন BDRunners হল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রানিং কম্যুনিটি।
তাছাড়া আমাদের LMC Runners নামে একটি Whatsapp গ্রুপ আছে যেখানে আমরা রানিং একটিভিটির পাশাপাশি এইসব ইভেন্টের ব্যাপারে আপডেট দিয়ে থাকি।
 
এবার আসি সুখবরটায়। এখন হতে প্রতি মাসে একবার একটি করে ইভেন্ট রাখব ৩-৪ কিলোমিটার দূরত্বের যেখানে LMC এর যেকোন প্রিমিয়াম, সিনিয়র সিটিজেন ও গেস্ট মেম্বার অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এই ইভেন্টগুলোতে (https://fb.me/e/2ZlBKAA0a) আমরা চেষ্টা করব ম্যারাথনের আদলে করতে তবে টাইম লিমিট বেশি রেখে যাতে সবাই দৌঁড়ে বা হেঁটে যেকোন ফিনিশ করতে পারে।
যারা ম্যারাথনের প্রস্তুতি নিতে চান তাদের জন্য বড় সুযোগ নিজের পারফরম্যান্স যাচাই করার। আর যারা সকালে হাঁটা শুরু করতে চান তাদের জন্য হতে পারে ভাল প্ল্যাটফর্ম।
আল্লাহ সবাইকে সুস্থ রাখুক এই কামনা করে শেষ করব Dr. Jahangir Kabir স্যারের একটি উক্তি দিয়ে:

“আমরা টাকা, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে ছুটতে মনের শান্তি হারাতে বসেছি। যার কারণে আমাদের অনেকের জীবনে এখন Pace (গতি) আছে কিন্তু Peace (শান্তি) নেই। কিন্তু রানিং হল এমন একটি একটিভিটি যেটা আপনার জীবনে Pace এবং Peace দুটোই একসাথে আনবে। কারণ রানিং একদিকে আপনার ফিটনেসের উন্নতির মাধ্যমে বাড়াবে আত্নবিশ্বাস আর অন্যদিকে মানসিক চাপ কমিয়ে এনে দিবে প্রশান্তি।“


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *